নিকট আত্মীয়র রক্তদান

পরিচিত এক আংকেল এর সার্জারী হলো। সার্জারীর সময় রক্তের প্রয়োজন হয়েছিলো। তার আপন ছোটভাই ছুটে এলেন রক্ত দিতে। নিকট আত্মীয়র রক্তদান নিয়ে সার্জারী সাকসেসফুল হলো। ৬ দিন পর আংকেল রিলিজ নিয়ে খুশি খুশি বাড়ি চলে আসলেন। ১১তম দিনে উনার শরীরে কিছু র‌্যাশ দেখা দিলো। ধীরে ধীরে জ্বর, হলকা জন্ডিস এবং আস্তে আস্তে তার শরীর খুব খারাপ দিকে টার্ন নিলো। পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি হলেন।

বড় বড় বেশ অনেকজন ডাক্তার তাকে দেখলেন এবং অনেক কষ্টে রোগ নির্নয় হলো। কিন্তু দুঃখজনক, শেষ পর্যন্ত তিনি মারা ই গেলেন। রোগ টা কি ছিলো?

রোগের নাম 𝐓𝐀-𝐆𝐕𝐇𝐃
𝐓𝐫𝐚𝐧𝐬𝐟𝐮𝐬𝐢𝐨𝐧 𝐀𝐬𝐬𝐨𝐜𝐢𝐚𝐭𝐞𝐝 𝐆𝐫𝐚𝐟𝐭 𝐕𝐬 𝐇𝐨𝐬𝐭 𝐃𝐢𝐬𝐞𝐚𝐬𝐞. রক্ত নেবার পর এই রোগ হয় অনেকের। এই রোগ টি হবার বেশ অনেকগুলো কারন আছে, তবে তার মাঝে একটি কারন হলো নিকট আত্মীয় থেকে যদি কেউ রক্ত গ্রহন করে।

যেমন এই আংকেল কে তার ছোটভাই রক্ত দিয়েছিলেন। চমকে উঠলেন??? ভাবলেন এ আবার কি বিপদ!! আপনি তো কতবার নিজের পরিবারের সদস্যদের রক্ত দিয়েছেন। নিকট আত্মীয়র রক্তদান নিয়েছি। কই কিছুই তো হয় নি!!

সারাজীবন তো জেনে এসেছেন যে কাছের লোকেরা রক্ত দিলেই নিরাপদ!!

আপনি সামান্য ভুল জেনে এসেছেন। আসলেই এমন ঘটনা হয়। তবে খুব খুব রেয়ার।

মৃত্যুহার ৯০-৯৫%

উপরে যে কেইস হিস্টোরী বল্লাম, ওটা আমার গত ৮ বছরের ডাক্তারি ক্যারিয়ারে দেখা একমাত্র কেস। সুতরাং বুঝতেই পারছেন এটা কত রেয়ার।

কিন্তু রোগ টা খুব রেয়ার হলেও মৃত্যুহার ৯০-৯৫%. অর্থাৎ এটি হলে মারা যাবার চান্স খুবই বেশী।

আচ্ছা এবার ব্যাখ্যা করি যে এটি কেন হয়। শরীরের ইমুন সিস্টেম সম্পর্কে যাদের ভালো জ্ঞান আছে তারা ভালো বুঝবেন।

আমাদের সবার শরীরেই রক্তের মাঝে ইমিউন সিস্টেমের অংশ হিসেবে কিছু সৈন্য সামন্ত ঘুরে বেড়ায়। এদের মাঝে বিখ্যাত একজনের নাম টি লিম্ফোসাইট (T Lymphocyte) বা টি সেল (T Cell)।

আচ্ছা, আজকে আদর করে ওকে টিলু ভাই ডাকা হোক। শিখাও হবে, মজাও হবে। তো টিলু ভাই করে কি, যখনি শরীরে কোন অপরিচিত কেউ ঢুকে, তখনি তাকে এট্যাক করে মেরে ফেলে।
যেমন ধরুন আজ ঠুস করে কোন ম্যাচিং ফ্যাচিং না করে আপনার কিডনী আমার শরীরে ফিট করে দিলাম। আমার রক্তের টিলু ভাই সাথে সাথে বিদ্রোহ ঘোষনা করবে। ঐ অপরিচিত কিডনী কে সে মেরে ফেলবে।

কিন্তু ম্যাচিং করে যদি কিডনী নেই আমি, তাহলে আমার নতুন কিডনী আর আমার টিলুভাই শান্তিপূর্নভাবে বসবাস করবে। মাঝে মাঝে একে অপরকে জিজ্ঞাসা করবে, “বাবু খাইসো?”

এবার বিষয়টা আরেকভাবে চিন্তা করুন, ধরুন আপনার রক্ত আমার শরীরে নিলাম। আপনার রক্তে ভেসে বেড়ানো আপনার শরীরের টিলু ভাই রা আমার শরীরে ঢুকে পড়লো।

ঢুকার সাথে সাথে তার মেজাজ হট হয়ে যাবে। কারন সে দেখবে ডাইনে বায়ে উপর নীচে সব শত্রু আর শত্রু। যেহেতু সে আপনার শরীর থেকে এসেছে, তার কাছে মনে হবে আমার কিডনী লিভার ফুসফুস বোন মেরো.. সবই শত্রু।

তখন সে শুরু করবে আমার বিভিন্ন অঙ্গ কে এট্যাক করা। কিন্তু সে বেশিক্ষন এট্যাক করতে পারবে না। কারন আমার শরীরের ইমুন সিস্টেম সহ আমার শরীরের টিলুভাই রা তাকে দেখে ফেলবে। দেখেই বুঝবে যে এরা ভিন্ন শরীর থেকে আসা টিলুভাই গ্যাং। তখন আমার শরীরের ইমুনিটি সাথে সাথে ওদের কে কান ধরে নিয়ে এসে থাপড়ায়া মেরে ফেলবে।

ব্যাস, সমস্যার সমাধান। এভাবেই আমরা রক্ত গ্রহন করার পর ডোনার এর রক্তের সাথে ভেসে আসা টিলুভাই এর আক্রমন থেকে বেচে যাই। কিন্তু,

এখন ধরুন আপনাকে রক্ত দিলো আপনার বোন।
যেহেতু আপনারা ভাইবোন, তাই কিছুটা সম্ভাবনা থাকে আপনার বোনের রক্তের টিলুভাই এবং আপনার রক্তের টিলুভাই অবিকল একই রকম দেখতে।
সুতরাং আপনার বোন এর রক্তের টিলুভাই আপনার শরীরে ঢুকে যখন গ্যান্জাম শুরু করবে, তখন আপনার শরীরের ইমুন সিস্টেম তাকে চিনতে পারবে না। কারন দেখতে অবিকল নিজের ঘরের টিলুভাই এর মতই।
এভাবে এরকম আপনজনের মুখোশ পড়ে আপনার বোন এর রক্তের টিলুভাই রা মনের সুখে আপনার শরীর ধ্বংস করতে থাকবে।
এদিকে আপনার ইমিউন সিস্টেম বোকার মত চুপচাপ বসে থাকবে। শত্রুকে চিনতেই পারবে না। এভাবে আস্তে আস্তে হয়তো আপনি মারা যাবেন। এই যে এই কন্ডিশনটা, এই বিশেষ রোগটার নাম ই TA GVHD..

আশা করি বুঝাতে পেরেছি।

করনীয় কী
বুঝেন আর না বুঝেন, TA GVHD সংক্রান্ত নীচের কয়েকটা পয়েন্ট শুধু মনে রাখেন-

১। জ্বী হ্যা। নিকট আত্মীয়র রক্তদান নিলে TA GVHD নামক ভয়ংকর একটি রোগ হওয়া সম্ভব। তবে খুব রেয়ার সম্ভাবনা। খুব রেয়ার।

২। হ্যা, এটা সত্যি এবং ভয়ের যে এ রোগের চিকিৎসা নেই। ৯০-৯৫% লোকই। মারা যায়। তবে আবার মনে করিয়ে দেই, এটি একটি রেয়ার রোগ।

৩। রেয়ার সম্ভাবনা হলেও, যেহেতু এটা হওয়া সম্ভব সেহেতু ডোনার হিসেবে অনাত্মীয় কাউকেই প্রথম প্রায়োরিটি দিন। একান্তই না পাওয়া গেলে ভিন্ন কথা।

৪। আত্মীয়র রক্ত যদি ইরেডিয়েট করে নিতে পারেন, তাহলে এই রোগ হবার সম্ভাবনা নেই। তবে এই ইরেডিয়েট করার ব্যাপারটা বাংলাদেশে খুব খুব খুব কম হাসপাতালেই হয়।

৫। রক্ত যেমন জীবন বাচায়, রক্তে তেমন জীবন ও যায়। সুতরাং রক্ত ডোনেশন সম্পর্কিত সব তথ্য ভালোমত জেনে নেওয়া আমাদের দ্বায়ীত্ব।

বিদ্রঃ টিলু ভাই ফিলু ভাই বলে বলে কিছুটা ফান করেছি। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।